২।কোনো কাজ বা জীবনের প্রতি আগ্রহ বা আনন্দ হারানো।
৩।অযথা ক্লান্তি এবং শক্তিহীনতা।
৪।ঘুমের সমস্যা (অতিরিক্ত ঘুম বা কম ঘুমানো)।
৫।ক্ষুধার পরিবর্তন (অতিরিক্ত খাওয়া বা ক্ষুধা হারানো)।
৬।মূল্যহীন বা অপর্যাপ্ত বোধ করা।
৭।আত্মহত্যার চিন্তা বা প্রচেষ্টা।
১. জৈবিক কারণ (Biological Factors):
- মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্যহীনতা: আমাদের মস্তিষ্কে নির্দিষ্ট কিছু রাসায়নিক উপাদান (যেমন সেরোটোনিন, ডোপামিন) অনুভূতি এবং মেজাজ নিয়ন্ত্রণ করে। এই রাসায়নিকগুলির ভারসাম্যহীনতা ডিপ্রেশনের কারণ হতে পারে।
- জেনেটিক্স (বংশগত কারণ): যদি পরিবারের অন্য কেউ ডিপ্রেশনে ভোগেন, তাহলে সেই ব্যক্তি ডিপ্রেশনের ঝুঁকিতে থাকতে পারেন। বংশগত কারণ ডিপ্রেশনের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে।
- হরমোনের পরিবর্তন: বিশেষ করে গর্ভাবস্থা, প্রসব, মেনোপজ বা থাইরয়েডের সমস্যা ডিপ্রেশনের কারণ হতে পারে। হরমোনের ওঠানামা মস্তিষ্কের রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলে এবং মানসিক অবস্থা পরিবর্তন করে।
২. মানসিক এবং আবেগজনিত কারণ (Psychological Factors):
- বিষাদগ্রস্ত মানসিক অবস্থা: যেসব মানুষ সাধারণত হতাশায় ভোগেন, তারা ডিপ্রেশনের ঝুঁকিতে থাকতে পারেন। তাদের মানসিক অবস্থা ইতিবাচক না থাকলে, সেই নেতিবাচকতা ধীরে ধীরে ডিপ্রেশনে রূপ নেয়।
- আত্মসম্মানহীনতা (Low self-esteem): যাদের আত্মবিশ্বাসের অভাব আছে, তারা প্রায়ই নিজেকে অপর্যাপ্ত মনে করেন, যা ডিপ্রেশনকে ত্বরান্বিত করতে পারে।
- আঘাত এবং দুঃখজনক ঘটনা: শৈশবে মানসিক বা শারীরিক নির্যাতন, কোনো প্রিয়জনের মৃত্যু বা বড় ধরনের ব্যক্তিগত ক্ষতি ডিপ্রেশনের একটি বড় কারণ হতে পারে।
৩. পরিবেশগত কারণ (Environmental Factors):
- জীবনের চাপ এবং সমস্যা: আর্থিক সমস্যা, চাকরির চাপ, সম্পর্কের জটিলতা, এবং পরিবারে ঝামেলার মতো বিষয়গুলো ডিপ্রেশনকে ত্বরান্বিত করতে পারে।
- সামাজিক বিচ্ছিন্নতা: একাকীত্ব এবং পরিবার বা বন্ধুবান্ধবের সমর্থনের অভাবও ডিপ্রেশনের অন্যতম কারণ। একা থাকা বা কারও সাথে নিজের সমস্যাগুলি ভাগ না করতে পারা মানসিক চাপ বাড়িয়ে দেয়।
- মাদক এবং অ্যালকোহলের অপব্যবহার: মাদক বা অ্যালকোহল নির্ভরতা মস্তিষ্কে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করতে পারে এবং এটি ডিপ্রেশনকে আরও খারাপ করে তুলতে পারে।
৪. আঘাতজনিত ঘটনা (Traumatic Events):
- ট্রমা বা পেছনের কষ্টকর অভিজ্ঞতা: যেসব ব্যক্তি অতীতে কোনো বড় ধরনের শারীরিক বা মানসিক আঘাত পেয়েছেন, তারা প্রায়ই ডিপ্রেশনে ভোগেন।
- বাল্যকালের কষ্টকর অভিজ্ঞতা: শৈশবে পরিবার থেকে দূরে থাকা, নিপীড়ন, শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন এবং উপেক্ষা ডিপ্রেশনের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে।
৫. বিপরীতমুখী ঘটনা (Reversed Situational Factors):
- জীবনের লক্ষ্য হারানো বা আকাঙ্ক্ষা পূরণ না হওয়া: যদি কেউ তার জীবনের লক্ষ্যে পৌঁছাতে না পারেন বা যে জিনিসটি তার জীবনের কেন্দ্রে থাকে সেটি হারিয়ে ফেলেন, তখন তারা ডিপ্রেশনে ভুগতে পারেন।
- প্রিয়জনের মৃত্যু বা বড় ধরনের ব্যর্থতা: ব্যক্তিগত ক্ষতি, প্রিয়জনের মৃত্যু, বা সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার কারণে অনেক মানুষ ডিপ্রেশনে ভুগতে পারেন।
ডিপ্রেশনকে "নীরব" রোগ বলা হয় কেন ?
ডিপ্রেশনকে "নীরব" রোগ বলা হয় কারণ এটি প্রায়শই বাইরে থেকে দেখা যায় না এবং আক্রান্ত ব্যক্তিরা তাদের সমস্যাগুলি প্রকাশ করতে চান না বা করতে পারেন না। এই রোগটি নীরবে ব্যক্তির মনের গভীরে বাসা বাঁধে এবং ধীরে ধীরে তার মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। নীরব বলতে বোঝানো হয় যে, একজন ব্যক্তি তার ভেতরে কষ্ট বয়ে বেড়ালেও বাইরের মানুষ তা উপলব্ধি করতে পারে না। এই কারণে ডিপ্রেশন প্রায়ই অবহেলিত থেকে যায় এবং সঠিক সময়ে সঠিক সাহায্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
কেন ডিপ্রেশনকে নীরব রোগ বলা হয়,,
১. লক্ষণগুলো সহজে দৃশ্যমান নয়:
ডিপ্রেশনের অনেক লক্ষণ বাহ্যিকভাবে সহজে বোঝা যায় না। মানসিক রোগগুলো শারীরিক অসুস্থতার মতো চোখে পড়ে না। একজন ব্যক্তি ভেতরে ভেতরে খুব কষ্ট পেলেও তার দৈনন্দিন আচরণে সেটা প্রকাশ পায় না। ফলে আশেপাশের মানুষ বুঝতে পারেন না যে, তিনি ডিপ্রেশনে ভুগছেন।
২. মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি:
আমাদের সমাজে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলা এখনও একটি ট্যাবু। অনেকেই মানসিক রোগকে দুর্বলতা মনে করেন এবং তাই ডিপ্রেশনের লক্ষণ প্রকাশ করতে লজ্জা বা ভয় পান। মানুষ প্রায়ই মনে করেন যে, ডিপ্রেশন নিয়ে কথা বললে অন্যরা তাকে বিচার করবে বা ছোট করে দেখবে। এই কারণে অনেকেই চুপচাপ থাকেন এবং তাদের মানসিক কষ্টের কথা কাউকে বলেন না।
৩. ব্যক্তির নিজস্ব সংকোচ এবং আত্মবিশ্বাসের অভাব:
ডিপ্রেশনের শিকার ব্যক্তিরা প্রায়ই আত্মবিশ্বাসহীনতা এবং অপর্যাপ্ততার অনুভূতিতে ভোগেন। তারা মনে করেন যে তাদের কষ্ট বুঝতে কেউ পারবে না, অথবা কেউ তাদের সাহায্য করতে পারবে না। এই কারণে তারা তাদের অবস্থা নিয়ে কথা বলেন না এবং নিজের মধ্যে সমস্যাগুলি চেপে রাখেন।
৪. মানসিক কষ্টের বহিঃপ্রকাশ ভিন্ন হতে পারে:
ডিপ্রেশনের লক্ষণগুলো বিভিন্ন ব্যক্তির মধ্যে ভিন্ন ভিন্নভাবে প্রকাশ পায়। কেউ খুব বেশি মনমরা থাকে, কেউ শারীরিক ক্লান্তিতে ভোগে, আবার কেউ এমনভাবে হাসি-খুশি থাকার ভান করে যে অন্যরা তার সমস্যার গভীরতা বুঝতে পারে না। অনেক সময় ডিপ্রেশনের লক্ষণগুলো এমনভাবে লুকিয়ে থাকে যে নিজেই তা উপলব্ধি করতে দেরি হয়।
৫. সামাজিক এবং পারিবারিক চাপ:
অনেক সময় ব্যক্তি তার চারপাশের সামাজিক এবং পারিবারিক চাপে নিজেকে "স্বাভাবিক" রাখার চেষ্টা করেন। পারিবারিক বা কর্মক্ষেত্রের চাপের কারণে মানুষ তাদের মানসিক সমস্যার কথা প্রকাশ করতে সাহস পান না। তারা মনে করেন যে তাদের দুর্বলতা প্রকাশ করলে অন্যরা কষ্ট পাবে, তাই সবকিছু চুপচাপ সহ্য করেন।
৬. সঠিক চিকিৎসার অভাব:
ডিপ্রেশন প্রায়শই নীরবে চলতে থাকে কারণ অনেকেই এর লক্ষণগুলোকে গুরুত্ব সহকারে নেন না। যখন তারা বুঝতে পারেন যে তারা ডিপ্রেশনে ভুগছেন, তখন অনেক সময় সঠিক চিকিৎসা বা সাহায্য পাওয়া সম্ভব হয় না। ফলে সমস্যা থেকে যায় এবং আরও গুরুতর আকার ধারণ করে।
ডিপ্রেশন থেকে মুক্তির উপায়ঃ
ডিপ্রেশন থেকে মুক্তির উপায় নিয়ে বিশদ আলোচনা করলে বোঝা যায় যে এটি একটি জটিল মানসিক সমস্যা, তবে সঠিক পদক্ষেপ নিলে ডিপ্রেশন থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। ডিপ্রেশন পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য না হলেও নিয়ন্ত্রণযোগ্য। এর জন্য মানসিক সহায়তা, সঠিক জীবনধারা, এবং চিকিৎসা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ডিপ্রেশন থেকে মুক্তির কিছু কার্যকর উপায়:
১. পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা (Professional Help):
- মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া: একজন দক্ষ মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা সাইকিয়াট্রিস্ট ডিপ্রেশন নির্ণয় করে উপযুক্ত চিকিৎসা পরামর্শ দিতে পারেন। ডিপ্রেশন গুরুতর হলে কখনো কখনো ওষুধ প্রয়োজন হতে পারে।
- থেরাপি বা কাউন্সেলিং: কথোপকথন থেরাপি (Talk Therapy) বা কাউন্সেলিং ডিপ্রেশন থেকে মুক্তির অন্যতম কার্যকর উপায়। বিশেষত, কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (CBT) এবং ইন্টারপার্সোনাল থেরাপি (IPT) ডিপ্রেশনের চিকিৎসায় কার্যকর।
২. নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম (Physical Activity):
- ব্যায়াম: নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম ডিপ্রেশনের সাথে লড়াই করতে সাহায্য করে। ব্যায়াম করলে মস্তিষ্কে "এন্ডরফিন" নামে একটি রাসায়নিক উপাদান নিঃসৃত হয়, যা আমাদের ভালো বোধ করতে সাহায্য করে এবং ডিপ্রেশনের অনুভূতি হ্রাস করে।
- যোগব্যায়াম ও মেডিটেশন: যোগব্যায়াম এবং মেডিটেশন মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক। এটি মনকে শান্ত করে এবং ডিপ্রেশন থেকে কিছুটা মুক্তি দেয়।
৩. সুস্থ খাদ্যাভ্যাস (Healthy Diet):
- পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ: স্বাস্থ্যকর এবং পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে। বিশেষত, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, ভিটামিন বি, এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাবার মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক।
- শর্করা ও প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়ানো: বেশি শর্করা এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার খেলে মস্তিষ্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে, যা ডিপ্রেশনকে আরও খারাপ করতে পারে। সুষম খাদ্যাভ্যাস মানসিক সুস্থতার জন্য প্রয়োজনীয়।
৪. পর্যাপ্ত ঘুম (Proper Sleep):
- ঘুমের গুরুত্ব: পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে ডিপ্রেশন আরও গুরুতর হতে পারে। প্রতিদিন ৭-৮ ঘণ্টা ঘুমানো শরীর এবং মস্তিষ্কের পুনরুজ্জীবনে সহায়ক।
- ঘুমের সময়সূচি ঠিক রাখা: প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমানোর চেষ্টা করা উচিত। রাতের ভালো ঘুম ডিপ্রেশনের লক্ষণ কমাতে সাহায্য করে।
৫. সামাজিক সহায়তা (Social Support):
- বন্ধু এবং পরিবারের সাথে যোগাযোগ রাখা: একা থাকার কারণে ডিপ্রেশন বাড়তে পারে। তাই পরিবার এবং বন্ধুদের সাথে খোলামেলা কথা বলা এবং নিজের অনুভূতি ভাগ করে নেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক সহায়তা ডিপ্রেশন কাটিয়ে উঠতে সহায়ক।
- সামাজিক কার্যক্রমে অংশ নেওয়া: বিভিন্ন সামাজিক বা সেবামূলক কার্যক্রমে অংশ নেওয়া বা অন্যের সাহায্যে এগিয়ে আসা মনকে ইতিবাচক রাখতে পারে। এতে ডিপ্রেশনের অনুভূতি হ্রাস পায়।
৬. স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট (Stress Management):
- স্ট্রেস কমানো: মানসিক চাপ বা স্ট্রেস ডিপ্রেশনের প্রধান কারণগুলোর একটি। চাপ কমানোর জন্য বিভিন্ন ধ্যান এবং শিথিল করার কৌশল ব্যবহার করা যেতে পারে।
- মেডিটেশন এবং রিলাক্সেশন টেকনিক: মেডিটেশন, ডিপ ব্রিদিং, এবং রিলাক্সেশন টেকনিক প্রয়োগ করলে মনের চাপ কমে এবং ডিপ্রেশনের অনুভূতি হ্রাস পায়।
৭. সৃজনশীল কার্যক্রম (Creative Activities):
- নিজের পছন্দের সৃজনশীল কাজ: পেইন্টিং, মিউজিক, লেখালেখি, নাচ বা যে কোনো সৃজনশীল কাজ করতে মন ভালো হয়। সৃজনশীল কাজ মস্তিষ্ককে নতুন কিছু ভাবতে এবং আনন্দিত রাখতে সাহায্য করে।
- নতুন কিছু শেখা: নতুন কোনো দক্ষতা শেখা বা কোনো শখ পূরণ করা মানসিক অবসাদ দূর করতে পারে।
৮. আত্ম-পর্যালোচনা এবং ইতিবাচক চিন্তা (Self-Reflection and Positive Thinking):
- নেতিবাচক চিন্তা এড়ানো: নেতিবাচক চিন্তা এবং নিজেকে তুচ্ছ মনে করা ডিপ্রেশন বাড়াতে পারে। নিজেকে ভালোভাবে মূল্যায়ন করা এবং ইতিবাচক চিন্তাভাবনা নিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করতে হবে।
- ডায়রি লেখা: নিজের অনুভূতি ডায়রিতে লেখা বা আত্ম-প্রকাশের অন্য কোনো মাধ্যম খুঁজে পাওয়া মানসিক চাপ কমাতে পারে। এটি নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।
৯. মাদক এবং অ্যালকোহল এড়ানো (Avoiding Drugs and Alcohol):
- মাদক এবং অ্যালকোহল: ডিপ্রেশনের সময় মাদক বা অ্যালকোহল গ্রহণ করলে তা মানসিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটায়। এগুলি মস্তিষ্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং ডিপ্রেশনের সমস্যাকে তীব্র করে তোলে।